ডীপফেইক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন এক দিগন্ত নাকি প্রতারণার অত্যাধুনিক পদ্ধতি

Source: Deep Learning on Medium

ডীপফেইক : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন এক দিগন্ত নাকি প্রতারণার অত্যাধুনিক পদ্ধতি

Deepfake কথাটি গত কয়েকদিন ধরেই প্রযুক্তি এবং বিশেষভাবে বলতে গেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এ.আই. নিয়ে আগ্রহীদের আলোচনার শীর্ষে । Deepfake ধারনাটি এআই সম্পর্কিত হলেও এর প্রভাব কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও পড়বে। তো দেরি না করে জলদি জেনে নিন Deepfake সম্পর্কেঃ

Deepfake কি?:

বর্তমান ইন্টারনেট এ ফেইক বা নকল ছবি এবং ভিডিও এর ছড়াছড়ি থাকলেও সেসব ছবি বা ভিডিও এর বাস্তবতা যাচাই ও খুব একটা কঠিন নয় কারণ এসব ভিডিও বা ছবির বেশিরভাগই কাচা হাতে করা ফটোশপ এর কারসাজি যেখানে একজনের দেহতে অন্য একজনের মাথা বসিয়ে কিম্ভূতকিমাকার কিছু বানিয়ে ইন্টারনেট এ ছেড়ে দেয়া হয়। এই ধরনের ছবি বা ভিডিও কে আমরা সাধারণত ফেইক বা নকল বলে থাকি। DeepFake টেকনোলজি দিয়ে তৈরী ফেইক ছবিগুলোকে সাধারণ চোখে দেখে নকল বলে বোঝা যায় না। এর কারণ হলো যায় যা সাধারণ মানুষ দেখে বুঝতে পারবে না কোনটি আসল ছবি এবং কোনটি ফেইক। DeepFake এর সাহায্যে একটি ছবি বা ভিডিওর কিছু অংশ আসল রেখে বাকিটুকু খুবই নিখুঁতভাবে নকল করা যায়। রিসার্চের জন্য খুবই অসাধারণ একটি টুল হলেও এর বর্তমানে এর বেশি ব্যবহার হচ্ছে নকল ছবি এবং ফেইক সেলেব্রেটি পর্ন ভিডিও তৈরীতে

Deepfake কিভাবে কাজ করেঃ

Deepfake ডিপ লার্নিং এর সাহায্য নিয়ে ফেইক ছবি এবং ভিডিও গুলো তৈরী করে থাকে। ডিপ লার্নিং এর Deep এবং ফেইক এর Fake এ দুটি শব্দ মিলিয়ে এর নামকরণ। আদতে Deepfake এ দুইটি আলাদা এ.আই. বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইউনিট কাজ করে। সহজ ভাষায় এখানে থাকে একটি ইমেজ ক্ল্যাসিফায়ার(যা ছবি দেখে বলে দিতে পারে যে ছবিটির গুণাগুণ কেমন) এবং একটি ইমেজ এডিটর(যা ছবিকে পরিবর্তন করে ঠিক ঠাক করতে পারে)। এডিটরটি প্রথমে একটি ইমেজ নিয়ে তাকে পরিবর্তন করবে যাতে বুঝা না যায় যে এই ইমেজটি পরিবর্তন করে বানানো হয়েছে এবং পরিবর্তিত ইমেজটি ক্ল্যাসিফায়ার অর্থাৎ যে ছবি চিনতে পারে তার কাছে দিয়ে দিবে। তারপরে ক্ল্যাসিফায়ারটি সেই পরিবর্তিত ছবিটিকে নিয়ে টেস্ট করবে , যদি সে ফেইক হবার ব্যাপারটি ধরতে পারে তাহলে সে তার পাওয়া ফলাফল এডিটরকে দিবে এবং তখন এডিটর সেই ফলাফল হিসেব করে ইমেজকে এডিট করবে এবং এডিটেড ইমেজকে আবারও ক্ল্যাসিফায়ার এর কাছে পাঠাবে। যখন ক্ল্যাসিফায়ার আর তার টেস্ট এ সে ধরতে পারবে না যে ছবিটি ফেইক তখন ছবিটি Deepfake বলে গণ্য হবে। এ পদ্ধতিকে কম্পিউটার সায়েন্স এর ভাষায় General Adversarial Network বা সংক্ষেপে GAN বলা হয়। গেইম থিওরি এর এই তত্ত্বের উপরে ভিত্তি করে বর্তমানে Deepfake টেকনোলোজি এগিয়ে যাচ্ছে। নিচের চিত্রটি দেখলে হয়তো ব্যাপারটি আরেকটু পরিষ্কার হবে

এই পদ্ধতি ততক্ষণ চলবে যতক্ষণ পর্যন্ত ফেইক কন্টেন্টটি তৈরী না হচ্ছে । আগে এই পদ্ধতিতে কাজ করা অসম্ভব এবং খরচসাপেক্ষ হলেও বর্তমান আধুনিক কম্পিউটারের উন্নত প্রসেসিং এর কারণে তা অনেকটাই বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ডিপফেইক তৈরী

Deepfake এর ব্যবহারঃ

Deepfake মূলত কম্পিউটার ভিশন এর একটি উচ্চতর প্রয়োগ। কম্পিউটার ভিশন হচ্ছে এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে গবেষকরা কম্পিউটারের সাহায্য অবজেক্ট ডিটেকশন(ক্যামেরার সামনে থাকা বস্তুটি কি), কোনও বস্তুর ছবি থেকে তার গুণাগুণ যাচাই ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে থাকেন। তাই Deepfake এর উন্নতি হবার মানে হচ্ছে সেই সেইম এলগরিদম বা পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরা কম্পিউটার ভিশন এর উন্নতি সাধন করতে পারবো। কম্পিউটার ভিশনের সাহায্য নিয়ে ক্যান্সার সেল ডিটেকশন, খাবারের গুণাগুণ নিশ্চিতকরণ সহ আরও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চলছে বর্তমানে। তাই Deepfake এর কোর টেকনোলজি এর উন্নতি সাধন হলে কম্পিউটার ভিশনেরও উন্নতি সাধন হবে। Deepfake টেকনোলোজি হলিউডের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতেও ব্যবহার করা হচ্ছে। জনপ্রিয় সাইন্স ফিকশন(সাইফাই) মুভি সিরিজ Star Wars এর 2018 তে বের হওয়া Solo : A Star Wars Story তে Han Solo এর চেহারাতে যুবক হ্যারিসন ফোর্ড এর চেহারা ব্যবহার করে Han Solo কে আরও বেশি হ্যারিসন ফোর্ড এর মতো বানানো হয়েছে। তাছাড়া এ বছরে রিলিজ হতে যাওয়া Star Wars Episode:IX এ প্রয়াত ক্যারি ফিশারের অভিনীত চরিত্র প্রিন্সেস লেইয়া কে মুভিতে ব্যবহার করতে Deepfake ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে আমেরিকা ভিত্তিক কিছু এড ও মডেলিং এজেন্সি জীবন্ত মডেল এর বদলে টেকনোলজি দিয়ে তৈরী ফেইক মডেল ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। Deepfake দিয়ে তৈরী মডেল এর দিকে যদি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ঝুকে পড়ে তাহলে আমরা হয়তো ফিল্ম ও মডেল ইন্ডাস্ট্রিতে সবচাইতে বড় স্ট্যাটাস শিফট দেখতে পাবো।

Deepfake এর অপব্যবহারঃ

Deepfake প্রযুক্তির গবেষণা ক্ষেত্রে AI কে উন্নত করতে ব্যবহার করা হয়ে থাকলেও এর মুল ধারার অনৈতিক ব্যবহার ও রয়েছে।Deepfake এর অনৈতিক ব্যবহারগুলোর মধ্যে সবচাইতে বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে ফেইক সেলেব্রেটি পর্নোগ্রাফি। Deepfake এর সাহায্য নিয়ে নিখুঁত ফেইক ভিডিও বানানো যায় বলে সেলেব্রেটিদের চেহারা অন্য একটি পর্নো ছবি বা ভিডিও তে লাগিয়ে তাদের ব্ল্যাকমেইল করা হয় বা তাদের অজান্তেই সেই ফেইক ছবি বা ভিডিও পর্নো সাইটে ছেড়ে দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে আবার দেখা যায় যে প্রতিশোধ নিতেও এই ধরনের পর্ন বানানও হয় Deepfake এর সাহায্য নিয়ে। সবচাইতে ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে রাজনীতিতে জনসাধারণ এর মতের উপরে প্রভাব ফেলার জন্যেও একে ব্যবহার করা হচ্ছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার একটি ভিডিও ক্লিপের অডিও পরিবর্তন করে এবং তার মুখের নড়াচড়ার পরিবর্তন করে কিছুদিন আগে ভাইরাল করে দেয় একটি রাজনৈতিক স্বার্থান্নেষী মহল। ওবামার এই ভিডিওটি ছিল “Synthesizing Obama” নামের একটি রিসার্চ প্রোগ্রামের বানানো কিন্তু এই ভিডিওটি ভাইরাল করা হয় রাজনৈতিক ফায়দা তোলার উদ্দেশ্য নিয়ে । DeepFake এর সাহায্য নিয়ে অ্যাডলফ হিটলার ও বর্তমান জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেল এর চেহারার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেহারা বসিয়ে দেয়া হয়। প্রযুক্তিবিদদের ধারণা মতে আগামী দিনগুলিতে Deepfake ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়া গোষ্ঠীর সংখ্যা আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাবে। রাজনীতির মতোন সেন্সেটিভ একটি বিষয়ে অল্প একটু গুজব ও খুব ভয়াবহ ফল নিয়ে আসতে পারে যেমনটা বাংলাদেশের কক্সবাজারের রামুর ঘটনার ক্ষেত্রে হয়েছিলো। বিশেষজ্ঞদের ধারণা যে 2020 এর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে Deepfake এর সাহায্য নিয়ে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হবে।

ইতিকথাঃ

যে কোন আধুনিক টেকনোলজির মতো ডিপফেইককেও ভালো খারাপ দুই ভাবেই ব্যবহার করা যায়। যেহেতু ডিপফেইকের সাহায্য নিয়ে খুব নিখুঁত নকল ছবি ও ভিডিও বানানো যায় তাই আমাদের উচিত এখন থেকেই এর ব্যাপারে সতর্ক থাকা যাতে কোন মহল এই টেকনোলজিকে অপব্যবহার করে আমাদের ক্ষতি করতে বা সমাজকে অস্থিতিশীল করে তুলতে না পারে। আমাদের আরও উচিত এই টেকনোলজিকে মানবজাতির কল্যাণের জন্য ব্যবহার করা। শেষপর্যন্ত আমাদের নৈতিকতাই ঠিক করে দিবে একটা টেকনোলোজি ভালো নাকি খারাপ কাজে ব্যবহৃত হবে। শীঘ্রই আরও নতুন লেখা নিয়ে আসবে AxionES তার আগ পর্যন্ত Stay well and stay techie

Deepfake এর ব্যাপারে আরও জানতে https://en.wikipedia.org/wiki/Deepfake